29 October, 2020

চট্টগ্রাম বন্দরে ৫১০ জন নাবিকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে গত ১০ দিনে আসা পণ্যবাহী জাহাজের ৫১০ জন নাবিকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। বন্দর স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলছেন, পরীক্ষায় কোনো নাবিকের মধ্যে করোনাভাইরাসের লক্ষণ পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া অন্য কোনো অসুস্থতার লক্ষণও পাওয়া যায়নি।

এদিকে সিঙ্গাপুরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এক বাংলাদেশির বিষয়ে সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা গতকাল সোমবার তাঁর দপ্তরে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দেশে করোনাভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হয়নি।

রংপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়া চীনফেরত শিক্ষার্থীর নমুনা পরীক্ষায় করোনাভাইরাস পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত হয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। ভর্তি থাকা চীনফেরত অন্য শিক্ষার্থীকে গতকাল সরকারি নির্দেশে ঢাকার একটি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে দ্বিতীয় শিক্ষার্থীর করোনাভাইরাসের কোনো লক্ষণ নেই। তাঁর অন্য সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে। কোনো ঝুঁকি না নিয়ে বা বিতর্ক এড়াতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়েছে বলে কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রথম আলোকে জানিয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা

১ ফেব্রুয়ারি চীন থেকে আসা জাহাজগুলো বন্দর জেটিতে আসার পর নাবিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। জেটিতে আসার পর শুধু জ্বর মেপে করোনাভাইরাসের পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপরই চীন থেকে যেসব জাহাজ আসছে, সেগুলো জেটিতে ভিড়ানোর আগে বন্দরের বহির্নোঙরে থাকার সময় নাবিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। আর বন্দর জলসীমায় আসার পর জাহাজের ক্যাপ্টেন বন্দরের কাছে নাবিকদের স্বাস্থ্যবিষয়ক ঘোষণা দিচ্ছেন, যেটি যাচাই করে বন্দর জেটিতে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। অথবা বহির্নোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানো-নামানোর অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।

বন্দর স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোতাহার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল সোমবার বহির্নোঙরে দুটি জাহাজ এবং আগের দিন রোববার তিনটি জাহাজে গিয়ে নাবিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। বন্দর থেকে তালিকা পাওয়ার পর বহির্নোঙরে গিয়ে নাবিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। এখন পর্যন্ত কোনো নাবিকের করোনাভাইরাসসহ অন্য কোনো অসুস্থতার লক্ষণ পাওয়া যায়নি।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, করোনাভাইরাস আক্রান্ত এলাকা চীনের সাংহাই বন্দর থেকে ১৪ দিনের মাথায় গতকাল বন্দরের বহির্নোঙরে আসে এমভি কালামাতা ট্রেডার নামের একটি কনটেইনার জাহাজ। এরপরই এই জাহাজে উঠে নাবিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান সহকারী বন্দর স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. আবছার উদ্দিন। জাহাজে শুধু জ্বর মেপে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। কারও কোনো কাশি, সর্দিসহ করোনাভাইরাসের লক্ষণ আছে কি না, তা মুখে জেনে নেওয়া হয়।

জানতে চাইলে সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নুরুল আবছার প্রথম আলোকে বলেন, কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে ভাইরাসটি ওই ব্যক্তির গায়ে ২ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত সুপ্তভাবে (ইনকিউবেশন) থাকতে পারে। এ সময়ের মধ্যে বা এরপর লক্ষণ প্রকাশ পায়। ফলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে ১৪ দিন পর লক্ষণ প্রকাশ পেত। আর এই জাহাজটির নাবিকেরা চীনের বন্দরে জাহাজেই ছিলেন। এরপরও তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার পর বন্দর কর্তৃপক্ষ জেটিতে ভিড়ানোর অনুমতি দিয়েছে।

এর আগে এমভি ইউনি হারভেস্ট নামে একটি পুরোনো জাহাজ বন্দর জলসীমায় আসার পর ওই জাহাজে থাকা ১৭ চীনা নাবিকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। এই ১৭ জন চীনা নাবিকের মধ্যে ১ জন চীন থেকে ওঠেন। পুরোনো জাহাজটি সীতাকুণ্ডে নেওয়ার পর নাবিকদের আকাশপথে চীনে যাওয়ার কথা রয়েছে।

আরও কিছু পদক্ষেপ

চীনসহ অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও নতুন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক শাহনীলা ফেরদৌসী গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, রাজধানীর উত্তরার কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে দ্রুত ২০ শয্যার একটি নতুন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) খোলার জোর প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বন্দর দিয়ে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ১০টি থার্মাল স্ক্যানার যন্ত্রের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অনুরোধ করে হয়েছে।

তথ্যে গরমিল

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, বিমান, নৌ ও সমুদ্রবন্দর দিয়ে আসা যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা।

গতকাল দুপুরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে স্বাস্থ্যসচেতনতায় করণীয় শীর্ষক বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, গত এক দিনে নৌবন্দর দিয়ে আসা ২৪০ জনের এবং সমুদ্রবন্দর দিয়ে আসা ৬ হাজার ২২৪ জনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেও মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।

করোনাভাইরাস: কোনো নাবিকের মধ্যে লক্ষণ মেলেনি। সিঙ্গাপুরে আক্রান্ত বাংলাদেশির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। চীনফেরত শিক্ষার্থী ঢাকায় ভর্তি।

সন্ধ্যায় পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইইডিসিআর জানিয়েছে, ২১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন বন্দর দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকা ৯০ হাজার ২৪৫ জনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। আর গত এক দিনে দুটি সমুদ্রবন্দর দিয়ে এসেছে ২৪০ জন এবং স্থলবন্দর দিয়ে এসেছে ৬ হাজার ২২৮ জন। আইইডিসিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নৌবন্দরের উল্লেখ নেই। মন্ত্রীর তথ্যে স্থলবন্দর নেই।

আবার আইইডিসিআর বলেছে, ২১ জানুয়ারি থেকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে আসা ৩২ হাজার ৩৩৭ জনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। আইইডিসিআরের গত পরশু আর গতকালের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাশাপাশি রাখলে গরমিল স্পষ্ট ধরা পড়ে। পরশু পর্যন্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা যাত্রীর সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ২১৩। পরের দিন নতুন করে ৬ হাজার ১৬২ জনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়। অর্থাৎ ২৪ হাজার ৩৭৫ জনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে শাহজালাল বিমানবন্দরে। বাড়তি ৭ হাজার ৯৬২ জনের তথ্য আইইডিসিআর কোথায় পেল তা স্পষ্ট নয়।

এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর বলেন, ভুল করে শুধু হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লেখা হয়েছে। সিলেট ও চট্টগ্রামের তথ্য যোগ হবে। গতকালের মতো আগেও কোনো দিন সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের তথ্য দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।

এতকাল স্বাস্থ্য বিষয়ে তথ্য সরবরাহ করে এসেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম। গত পরশু কন্ট্রোল রুম ও আইইডিসিআর সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যাত্রীর ব্যাপারে দুই রকম তথ্য দিয়েছিল। এ নিয়ে গতকাল প্রথম আলোতে প্রতিবেদন ছাপা হলে কন্ট্রোল রুমকে সাংবাদিকদের করোনাভাইরাস বিষয়ে কোনো তথ্য না দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তাই গতকাল কন্ট্রোল রুম কোনো তথ্য দেয়নি।