Today : 05 December, 2020

নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর

 

নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হয়ে ভারতের একমাত্র মুসলিম প্রধান রাজ্য কাশ্মীরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দুর্বল করে দেন। শুধু তাই নয়, কাশ্মীরের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা কংগ্রেস সমর্থক শেখ আবদুল্লাহ এবং তাঁর পরিবারের মুসলিম নেতাদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মুসলিম-প্রধান কাশ্মীরের জনগণের উপর নির্যাতন চালানোর লক্ষ্যে সেখানে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে এবং দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে কাশ্মীরও ভারতের কেন্দ্র-শাসিত রাজ্যে পরিণত করেছেন।
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে মুসলিম বিরোধী গণহত্যা চালিয়ে এককালের ‘গুজরাটের কশাই’ নামে পরিচিত নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশের জনগণের বিরাগভাজন; বাংলাদেশের জনগণ আশা করেছিল গুজরাটের মুসলিম বিরোধী দাঙ্গার পর দিল্লির মুসলিম গণহত্যায় নেতৃত্বদানকারী নরেন্দ্র মোদীকে কোনো অছিলায়ই কোনো দিন বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানো হবে না। বাংলাদেশের জনগণের এই স্বাভাবিক প্রত্যাশার বিরোধিতা করেছেন আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তাঁর বক্তব্যের স্বপক্ষে যুক্তি (কুযুক্তি) দিতে গিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অকৃত্রিম বন্ধু ও সর্বাত্মকভাবে সহায়তাদানকারী দেশ ভারত। সে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে বাংলাদেশে আসছেন। যারা তাঁর আসার বিরোধিতা করছেন তাদের উচিৎ নরেন্দ্র মোদীকে স্বাগত জানানো।

কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ ওবায়দুল কাদেরের এ সম্পর্কিত বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তারা মনে করেন, নরেন্দ্র মোদীর মতো কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা যিনি গুজরাটের মুসলমানদের রক্তে হাত রাঙ্গানোর পর এই সেদিনও দিল্লির মুসলমানদের রক্তে হাত রাঙ্গিয়ে ‘দিল্লির কশাই’ অভিধায় অভিহিত হওয়ার ‘যোগ্যতা’ অর্জন করেছেন, তাকে মুসলমান অধ্যুষিত বাংলাদেশের জনগণ কিছুতেই স্বাগত জানাতে পারে না। তারা আরো মনে করেন, বাংলাদেশের মতো মুসলিম-প্রধান দেশে যদি নরেন্দ্র মোদীর মতো এককালের ‘গুজরাটের কশাই’ নামে অভিহিত এবং ‘দিল্লির কশাই’ নামে অভিহিত হওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জনকারী নরেন্দ্র মোদীকে আমন্ত্রণ জানানো হয় তার দ্বারা বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানকেই অবমাননা করা হবে।

ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে ‘শেখ উপাধিধারী দুই বিখ্যাত নেতার কথা উল্লেখ করতে চাই। এদের দু’জনেরই জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল নিজ নিজ জন্মভূমির স্বাধীনতা অর্জন। এদের একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আরেকজন শেরে কাশ্মীর শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ এদের একজন (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) সঠিক অবস্থান করে বৃটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে নিখিল ভারত মুসলিম লীগে যোগদান করে প্রথমে পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে প্রথমে পাকিস্তান এবং পরে বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নিজের জীবনের লক্ষ্য অর্জনে সাফল্য অর্জন করেন। অন্যজন (শেখ আবদুল্লাহ) ভুল পথ অবলম্বন করে তার জীবনের লক্ষ্য কাশ্মীরের স্বাধীনতা থাকা সত্তে¡ও কংগ্রেসের সমর্থক হওয়ায় তার জীবনের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতার বেদনা নিয়ে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহর পারিবারিক বন্ধু পন্ডিত জওহর লাল নেহরুর প্রধানমন্ত্রিত্বকালেই কাশ্মীরের স্বাধীনতা দাবি করার অপরাধে ভারতের কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়ে জীবনের লক্ষ্য অপূরিত রেখে মৃত্যু বরণ করতে বাধ্য হন।

আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের যে বলেছেন, ভারত বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু, তার প্রমাণ ভারত আমাদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য দিয়েছিল, একথার মধ্যেও সম্পূর্ণ সত্য নেই। ভারতের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ প্রধানত ছিলেন হিন্দু। তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মতো কোনো দিনই পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেননি। কারণ, কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ ছিলেন অখন্ড ভারতের সমর্থক। তাঁরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো কোনদিনই ভারত বিভাগ ও মুসলিম-প্রধান পাকিস্তান বা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার সমর্থক ছিলেন না।

এসব ঘটনা প্রমাণ করে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র হিসাবে শক্তিশালী হয়ে উঠুক তা কখনই চায়নি ভারত। অর্থাৎ ভারত মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সমর্থন দান করেছিল এ লক্ষ্যে যে, একটি শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভেঙ্গে যাতে দুটি দুর্বল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অভ্যুদয় হয়। এতে আরও প্রমাণিত হয় যে, বঙ্গবন্ধু কখনও বাংলাদেশকে হিন্দু প্রধান ভারতের একটি আশ্রিত রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাননি। চেয়েছেন একটি স্বাধীন সার্বভৌম শক্তিশালী মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে। এবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বুঝে নিন, তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য কতটা ছিল।