31 October, 2020

রাজধানীর নদী-নালা উদ্ধারে বিভিন্ন ব্যবস্থা

রাজধানীর আশপাশের বিভিন্ন নদী এবং খালগুলো অবৈধ ভাবে দখলদারদের কাছে আছে। ঢাকার যোগাযোগ ক্ষেত্রে যে খালগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত তার সিংহভাগ এখন দখলদারদের কবলে পড়ে অস্তিত্ব হারিয়েছে। বাদবাকি অংশ দখল ও দূষণে পরিণত হয়েছে নোংরা নালায়। নদী, খাল, লেকসহ প্রাকৃতিক জলাশয় সুরক্ষায় বর্তমান সরকার আমলে অঙ্গীকারবদ্ধ ভূমিকা রাখার কথা বারবার বলা হলেও তা রক্ষায় কাক্সিক্ষত সাফল্য আসেনি বিভিন্ন স্তরের দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলায়। গত আট বছরে ঢাকার ১১টি খাল নর্দমা আর ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। আবর্জনায় জমাটবাঁধা খালের নর্দমায় খুঁটি পুঁতে পাটাতন বসিয়ে তার ওপর একের পর এক বস্তি তোলা হয়েছে। স্থায়ীভাবে আটকে গেছে পানিপ্রবাহের পথ। ৩০-৩২ বছর আগেও ঢাকার প্রান্তসীমায় স্রােতোবাহী যেসব খালে পণ্যবাহী বড় বড় নৌকার আনাগোনা ছিল, সে খালগুলো এখন দুই-আড়াই ফুট চওড়া নর্দমার আকার ধারণ করেছে। এমনকি সরকারি ওই দফতরে খালগুলোর কোনো নথি নেই। ওয়াসার একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশেই প্রভাবশালী মহল বছরের পর বছর ধরে খাল দখলের মচ্ছব চালিয়ে আসছে। তারা প্রথমেই খালের নির্দিষ্ট কোনো পয়েন্টে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেয়। পরে বাঁধ ঘেঁষে রাতারাতি গড়ে তোলা হয় একের পর এক বস্তিঘর। ওয়াসা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে খালের মূল নথিপত্র বের করে সে আদলেই মালিকানা-সংক্রান্ত জাল কাগজপত্র বানিয়ে নেয় তারা। এর পরই বস্তিবাসীকে খালের অন্য অংশে সরিয়ে সে জায়গা প্লট আকারে বিক্রি করে দেয় প্রভাবশালী দখলবাজরা। রাজধানীর খাল, বিল, লেক, বিলঝিল ভরাট ও অপদখলের শিকার হওয়ায় পরিবেশ বিপন্ন হয়ে পড়ছে। যে প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো মানুষের হৃদরাজ্য ভালোলাগার অনুভূতি সৃষ্টি করত সেগুলোর মধ্যে যেগুলো টিকে আছে তা মশা উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। দখল-দূষণে সেগুলোরও অস্তিত্ব এখন বিপন্নের পথে। রাজধানীতে মানুষ বসবাসের পরিবেশ টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনের সুবিধা নিশ্চিত করতে অপদখলকৃত খালগুলো উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। যেগুলোর অস্তিত্ব এখনো কোনোরকমে টিকে আছে সেগুলোর সংস্কারও জরুরি। এ ব্যাপারে সরকার, সিটি করপোরেশন সবার অঙ্গীকারবদ্ধ ভূমিকা প্রত্যাশিত।

ঢাকার প্রাণ সঞ্চারকারী নদী বুড়িগঙ্গার সঙ্গে এক সময় সরাসরি নৌপথের সংযোগ ছিল ঢাকার বিভিন্ন খালের। সারা ঢাকার জলযান যাতায়াত করত এসব খাল দিয়ে। কিন্তু সে দৃশ্য এখন কল্পনাতীত। আর হবেই বা না কেন, খাল কোথায়? চোখেই তো পড়ছে না। কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে তা নেই। যে কারণে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা হুমকির মুখে। পানি নিষ্কাশনের দুটি পথ রয়েছে। প্রথমত ভূ-গর্ভে পানি শোষণ করে নেয়া এবং অন্যটি খাল বিল ও ড্রেন দিয়ে নদীতে চলে যাওয়া। রাজধানী ঢাকায় এই দুটি পথের একটিও কার্যকর নেই। যে কারণে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। এ থেকে মুক্তি পেতে হলে জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিকল্পিত উপায়ে সরকারকে খাল উদ্ধার করতে হবে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিদ্যমান খালগুলোর মধ্যে রামচন্দ্রপুর খাল ১০০ ফুটের জায়গায় ৬০ ফুট, মহাখালী খাল ৬০ ফুটের জায়গায় ৩০ ফুট, প্যারিস খাল ২০ ফুটের স্থলে ১০-১২ ফুট, বাইশটেকি খাল ৩০ ফুটের স্থলে ১৮-২০ ফুট, বাউনিয়া খাল ৬০ ফুটের বদলে ৩৫-৪০ ফুট, দ্বিগুণ খাল ২০০ ফুটের বদলে ১৭০ ফুট, আবদুল্লাহপুর খাল ১০০ ফুটের বদলে ৬৫ ফুট, কল্যাণপুর প্রধান খাল ১২০ ফুটের স্থলে স্থানভেদে ৬০ থেকে ৭০ ফুট, কল্যাণপুর ‘ক’ খালের বিশাল অংশে এখন সরু ড্রেন, রূপনগর খাল ৬০ ফুটের স্থলে ২৫ থেকে ৩০ ফুট, কাটা সরু খাল ২০ মিটারের বদলে ১৪ মিটার, ইব্রাহিমপুর খালের কচুক্ষেত সংলগ্ন মাঝামাঝি স্থানে ৩০ ফুটের স্থলে ১৮ ফুট রয়েছে। এসব খালের অধিকাংশ স্থানে প্রভাবশালীরা দখল করে বহুতল ভবন, দোকানপাট ও ময়লা অবর্জনায় ভরাট করে রেখেছে। ফলে খালে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় বিলীন হয়ে গেছে অস্তিত্ব।

রাজধানীর খিলগাঁও রেলগেট ফ্লাইওভার সংলগ্ন ফার্নিচার দোকানগুলোর সামনে খিলগাঁও-বাসাবো খালের নাম সংবলিত ঢাকা ওয়াসার একটি ফলক রয়েছে। এতে খাল দখলমুক্ত রাখতে সচেতনতামূলক বিভিন্ন কথা লেখা রয়েছে। তবে ফলকটির আশপাশের কোথাও খালের কোন অস্তিত্ব নেই। আর একটি ঐতিহ্যবাহী খালের নাম ছিল ধোলাইখাল। এটির নামের সঙ্গে এখনও মানুষ পরিচিত। এই খালের ওপর নির্মিত হয়েছে বহুতল অট্টালিকা। এছাড়া যতটুকু খাল অবশিষ্ট রয়েছে তাও যেন মৃত্যুপথযাত্রী। শীর্ণকায় নর্দমায় পরিণত হয়েছে খালগুলো। দখল দূষণে শীর্ণ রাজধানীর খালগুলো দিন দিন অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। ড্রেনের মতো বয়ে চলা এসব খাল একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ করছে, আবার এর ভেতরে পড়ে প্রাণহানির ঘটনাও কম ঘটছে না। সম্প্রতি এই খালের মধ্যে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন দখল হয়ে যাওয়া খালগুলোর পাশে বেশিরভাগ নিম্ন আয়ের মানুষের বাসস্থান তৈরি করেছে। নর্দমা ভরে থাকার কারণে বেখেয়ালে শিশুরা যখন খালের মধ্যে ডুবে যায় তখন উদ্ধার করাও কষ্টকর হয়ে পড়ে। মানুষের অসচেতনতার কারণে গৃহস্থালি ও শিল্প বর্জ্য নিক্ষেপের ফলে বর্জ্যরে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে রাজধানীর লেক ও খালগুলো। যে কারণে রাজধানীতে টানা বর্ষণে পানির প্রবাহ আটকে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য বৃদ্ধি করতে হবে জনসচেতনতা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে হতে হবে কর্মতৎপর। যতটুকু খাল রয়েছে সেগুলো উদ্ধার করেও যদি তা খালের আকার ধারণ করানো যায় তাহলেও কমবে জলবদ্ধতা। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে দখলদারদের হাত থেকে খালগুলো উদ্ধার করে সেসব পুনর্খনন করতে হবে। খাল প্রাণ পেলে নদীগুলোতেও প্রাণ ফিরবে, মুমূর্ষু ঢাকায়ও প্রাণসঞ্চার হবে।