26 October, 2020

অতলান্তের মাছ

 

 

তুচ্ছ তেলাপোকাকে জীবন্ত জীবাশ্ম বলা হয়। পিঠের মধ্যে কী জানি অনুভূত হতেই একটা আছাড় মারলাম। পোকাটা চিৎ হয়ে ছাদ দেখে। অনেক সময় রাষ্ট্রেরও এরকম হয়। ইংরেজরা ভারতবর্ষ নামক কচ্ছপকে উল্টে দিয়ে, দু’শ বছর আকাশ দেখিয়েছে। কেউ কেউ বলবে ইংরেজরা এসেছিল বলেই টুকটাক ইংলিশ বলতে পারো, না-হলে রেল কোনোদিন চোখে দেখতে? ইংরেজ কূটনীতিক টমাস রো সম্রাট জাহাঙ্গীরের কন্যাকে দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত করার জন্য ইংরেজ ডাক্তার নিয়ে এসেছে। জাহাঙ্গীর-কন্যা সুস্থ হলে সম্রাট পুরস্কার দিতে চাইলে রো স্বজাতির জন্য শুল্কমুক্ত ব্যবসার সুযোগ চেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচ্ছত্র রাজত্ব। তখন চিন্তার আকাশ ছিল বিহঙ্গ। শরীরের শক্তি ছিল সীমাবদ্ধ। ’৪৭-এর পর উল্টে গেল—চিন্তার আকাশ সীমাবদ্ধ। শরীরের শক্তি অবারিত। মনির তোমাকে বলেছে, ‘কিরে তুই তো ছাত্রজীবনে একটাতেও প্রথম হছ নাই। এসব চিন্তাশীল কথা তুরে কে শিখাইছে।’ তুমি বলো, ‘আরে ব্যাটা, কথা কাউরে শিখাইতে হয় না। এখন এতো কথা হয়। একটু চুপ কইরা থাইলে ভেতরে কথার গাছ বড় হয়। ডালপালার বিস্তার ঘটে। পাখি আসে, ফল ঠুকরে খায়।’

বাসে শানির আখড়া যাবো। স্কুলের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সভা হবে। মন একবার বলছে যাবো। আর একবার বলছে যাবো না। যাবো, যাবো না...। মনের সঙ্গে বৈঠকে বসি। কেন যাবো না? সেখানে গিয়ে দেখব প্রাতিষ্ঠানিক পদ দখল করা নাগরিকরা যারা রাউবি-র পূর্বের ভালো ছাত্র। জ্ঞানগর্ব আলোচনায় পৃথিবীকে ভাসিয়ে দিচ্ছে। তুমি প্রতিষ্ঠান পছন্দ করো না, কাজেই তোমার ভালো লাগবে না। কেন যাবো? তুমি শুনবে সেই প্রোগ্রামে না-যাবার কারণে তোমার জীবনের বারো আনাই মিছে। কারণ প্রাক্তন ছাত্রদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় টুইন-টাওয়ার সৃষ্টির মন্ত্রণা থাকবে। টুইন-টাওয়ার মানেই প্রবৃদ্ধি। কাজেই পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন। ১০ মহরমের মর্সিয়া ক্রন্দনের দিন, তুমি বাসের জন্য লিংক রোড এসে দাঁড়ালে। চরম বিরক্ত না হলে যথাগন্তব্যের বাস আসে না। সময়মতো মন তিতিবিরক্ত হলে বাসবোরাকের দেখা মেলে। তুমি বাসে উঠে যথারীতি দাঁড়িয়ে ঘামতে থাকো। গাড়ি চলে চলে-না গতিতে। তোমাদের বৃহত্তর ফ্লাইওভারের নিচে আসামাত্র একজন ট্রাফিক সার্জেন্টের ইশারায় বাসটা একপায়ে মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে যায়। এক যাত্রীর মুখগহ্বর থেকে কথাটা ফসকে বেরিয়ে যায়—আবার ঘুষ দিতে হইবো। বাক্যটি ট্রাফিকের মস্তিষ্কে ক্যারামের স্ট্রাইক গুটির মতো বাড়ি মারে। সে একপায়ে দাঁড়ানো বাসের চাবি নিয়ে যায়। ড্রাইভারকে বলে কাগজপত্র নিয়ে আসতে। পেছনে লম্বা জ্যাম লেগে যায়। তাতে ট্রাফিকের বাপের কী? বাসের কন্ডাকটর বলে, ঘুষের কথা কে বলছেন? সার্জেন্ট বলেছে তারে নিয়া যাইতে। নাইলে বাস ছাড়বে না। ঘুষের কথা কে বলছেন? সহযাত্রীর পক্ষ নিয়া ১০/১২ জন একসঙ্গে বলে আমরা বলছি। যান গিয়া বলেন সবাই বলছি। কন্ডাকটর গিয়া সার্জেন্টরে সেই কথা বললে, সার্জেন কয় : কাজ হবে না, ওকে নিয়া আসো। কন্ডাকটর এসে ওই সহযাত্রীকে বলে, ভাই আপনি গিয়ে শুধু একবার সরি বলবেন। তাইলেই হইবো, নাহলে গাড়ি রেকারে দিয়া দিবো। ২২শ ট্যাকা লাগবো। বাসের যাত্রী-সাধারণের সহ্যসীমা ভেঙে যায়। তরতর করে ঘাম বেয়ে পড়ে। তারা দ্বিধাবিভক্ত হয়। কেউ কেউ বলে, ওই আপনে ট্রাফিকের কাছে যান। কেউ বলে, না যাইয়েন না। শেষে লোকটি বাস থেকে নামে। সবার চোখের সামনে লোকটা দৌড়ে অন্য একটি চলন্ত বাসে বান্দরের মতো ঝুলে পালিয়ে যায়। তখন বাসের যাত্রীরা আলোচনা করে, ভালোই করছে, আর না-হলে ট্রাফিক ঝামেলা করতো। কন্ডাকটর বলে আপনেরা সবাইতো কইছেন, ঘুষের কথা সবাই কইছেন। অহন শালা যে পলাইয়া গেছে ২২শ টাকা কে দিবো? পেছন দিক থেকে একজন যাত্রী চেঁচিয়ে বলে তুমি হুদাই পাট নিও না। সিটিং সার্ভিসের ভাড়া নিয়া ১০ টাকার জন্য দুইজন যাত্রী তুলতে যাইয়াই তো সার্জেন্টের সামনে পড়ছ। কন্ডাক্টর আর কোনো কথা বলে না। বাসযাত্রীদের মধ্যে মাঝবয়সী একজন বলে, সবার মনের কথা একজনের মুখ দিয়া বাইর হইয়া গেছে। ওই বেচারা খারাপ কইছে কী? তারা কি ঘুষ খায় না?

কী আর করা, বাস থেকে নেমে হাঁটি। হাঁটতে হাঁটতে জনৈক এক নৃত্যশিল্পীর কথা মনে পড়ে। তিনি এক প্রোগ্রামে বলেছিলেন, কুড়িগ্রাম থেকে এক ছেলে আমার কাছে আসে। তার নাচের খুব শখ। আমি তাকে বলি ঢাকায় চলে আসো—নাচের স্কুলে ভর্তি হয়। তার আগ্রহ তারিফ করার মতো। ১০/১৫ দিনে আমি তাকে একটু একটু চিনি, জানি। এক বিকেলে আমাকে বলে, আমি আপনাকে মা বলে ডাকতে পারি? আমার অনেক দুঃখ—আপনি শুনবেন। ছেলেটি বলে, আমার জন্মের আগে দাদা ও নানা, আমার মা ও বাবার বিয়ে ঠিক করে। সেই বিয়েতে তারা রাজি ছিল না। কিন্তু সেই বিয়ে না হলে বিশাল সম্পত্তির কানা-কড়িও তারা পাবে না। মা ও বাবা তাদের পৃথক পৃথক প্রেমময় সম্পর্ক মুলতবি রেখে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়—কোনোভাবেই সম্পত্তি হাতছাড়া করা যাবে না। তারা সম্পত্তি নিজেদের নামে দলিল করার জন্য বিয়েতে রাজি হয়। নানা ও দাদাকে সম্পর্কের আঠা বোঝাবার জন্য আমার আগমন ঘটায়। দাদা ও নানা তাদেরকে সম্পত্তির অধিকার দেয়া মাত্র পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পুনরায় পূর্বের প্রেমময় সম্পর্ক মেরামত করে সুখে-শান্তিতে বসবাস করে। তারা জানায়, আমি হচ্ছি তাহাদের সম্পর্কের বিষ। আমার দায়িত্ব কেউ নেবে না। নামপদ হিসেবে মা-বাবার শূন্যস্থানে তাহাদের নাম ব্যবহার করতে পারবো না। ছেলেটি বলে : মা, আমার কী দোষ! এই স্তব্ধ ইমেজটি মস্তিষ্কে কাঠচেরা করাতকলের মতো কট কট করে।

মা-বাবা আলাদা হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয় সন্তানকে। সন্তানের মুখ দেখে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হয়েছিলাম। ছোট বাবার ঠোঁট নাড়া, তাকিয়ে থাকা, হিয়ার ভেতরে এক অদ্ভুত ভালো লাগে। রূপকথার দৈত্যের প্রাণটি কোনো এক ভ্রমরে থাকে। সন্তানই আমার প্রাণ ভ্রমরা। তার স্পর্শ-গন্ধ নিজের এক নতুন আমি। বিয়ের আগে প্রেমিকাকে বলেছিলাম, সন্তান উৎপাদনের জন্য স্বামীকে বা স্ত্রীকে ভালোবাসতে হয় না। দেহের সঙ্গে দেহের ঘর্ষণ সম্পর্কিত সংযোগ গর্ভ আঁধারে এক ম্যানহাটন প্রজেক্ট। সন্তান তো মায়ের অংশ। সন্তান তো বাবার অংশ। মা ধীরে ধীরে সন্তানের বাবাকে ভালোবাসতে শেখে। ধীরে ধীরে প্রেমিককে ভুলে যায়। কিংবা মধ্যরাত্রির কল্পনায় প্রেমিক। তার চেয়ে ভালো নয়—একজনই প্রেমিক ও সন্তানের পিতা। কথাটা প্রেমিকাকে বউ হিসেবে কাছে পেতে আয়াতের মতো কাজ করে। প্রেমিকার গর্ভে নিজের পুনর্জন্ম—এক অব্যক্ত তাজমহল। আমার এই পুনর্জন্ম মা কি জানে!

জাপানের কথা মনে হলেই মনে পড়ে হিরোশিমা। নাগাসাকি। সমস্ত মৃতের সাক্ষ্য এক বা একাধিক সৌধ ভুলে গিয়ে আবার কর্মব্যস্ততা। যদিও দক্ষযজ্ঞই ধ্বংসের কারণ। কাঁচা মাছ কখনো খাইনি। জাপানিরা টাটকা সুশি মাছ কাঁচা খায়। মাছটা সুস্বাদু। সস দিয়ে খেতে হয়। গভীর সমুদ্রে পাওয়া যায় মাছটা। কিন্তু সমুদ্র থেকে ধরে রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত পৌঁছাতে সুশি মাছ তেমন বাঁচে না। বিস্তর গবেষণার পর দক্ষেরা বের করল, জাহাজের চৌবাচ্চায় হাঙরের বাচ্চা ছেড়ে দাও। তাই করা হলো : হাঙরের মুখ থেকে বাঁচার জন্য মাছগুলো অধিকতর সাঁতার তৎপরতায় মরতে ভুলে যায়। অর্থাৎ মরণ দীর্ঘায়িত হয়। ধাঁরালো ছুরির আহ্লাদে সসের দ্রবণে সুশি মাছের ফালি জিহ্বায় ভুবন ভুলানো স্বাদের ব্যঞ্জনা তৈরি করে! এক আনন্দ সম্রাটের তুচ্ছ অনুসঙ্গ হিসেবে, আমি যেন সুশি মাছ। করোটিতে ভয়, উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা, দারিদ্রের...হাঙর ক্রমাগত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।